প্রকৃতিতে ফিরলো মহাবিপন্ন শিলা কচ্ছপ!

কৃত্রিম প্রজননে জন্ম নেয়া পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ। ছবি: সিসিএ

বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে তিন দশক আগে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ। তবে সংরক্ষিত প্রজনন ব্যবস্থাপনায় জন্ম নেয়া দশটি শিলা কচ্ছপ ফিরেছে প্রকৃতিতে। গেল ১৮ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে কচ্ছপগুলো।

বান্দরবন জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহায়তায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই প্রজাতির কচ্ছপ পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেয় ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন এলায়েন্স-সিসিএ, টার্টেল সারভাইভাল এলায়েন্স-টিএসএ এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ। এজন্য গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে করা হয়েছে কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র।

কচ্ছপ গবেষকদের মতে, প্রায় তিন দশক আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ। বাংলাদেশের বনাঞ্চলের বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মহাবিপন্ন কচ্ছপ প্রজাতিটিকে।

সিসিএ’র গবেষক শাহরিয়ার রহমান সিজার বেঙ্গল ডিসকাভার-কে বলেন, “পাঁচ বছর পর থেকে আমরা বছর অন্তত ১০০/২০০ কচ্ছপ বনে ফিরিয়ে দিতে পারবো। আর এটি সময় সাপেক্ষ। কারণ আমাদের কাছে যে কচ্ছপ রয়েছে তার অনেকগুলোই প্রাপ্তবয়ষ্ক নয়। একটি কচ্ছপ বা কাছিমের প্রজনন ক্ষমতা আসতে আট থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লাগে। ইতিমধ্যে মহাবিপন্ন শিলা কচ্ছপের ৪৬টি বাচ্চা আমরা উৎপন্ন করেছি। পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি কচ্ছপ আমরা প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।

বান্দরবানের আলিকদমের বনে অবমুক্ত করা হচ্ছে পাহাড়ি শিলা কাছিম।

“অবমুক্ত করার পরবর্তী সময়ে প্রাণীগুলোর গতিবিধি এবং টিকে থাকা পর্যবেক্ষণ করতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের এমন কিছু মানুষদের ফিল্ড টেকনিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। যারা পূর্বে বন্যপ্রাণী শিকারি ছিলেন। এই প্রজাতির কচ্ছপ এবং তাদের আবাসস্থলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে একটি গ্রাম সংরক্ষণ কমিটিও,” যোগ করেন গবেষক সিজার।

“বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এন্টি মাইক্রোবিয়াল রেসিসটেন্স একশন সেন্টারে কচ্ছপের নানা রকম প্যাথলজিক্যাল পরিক্ষা করানো হয় এবং সেগুলোতে কোন রোগের লক্ষণ ছিল না। শারীরিক পরিক্ষার মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করেছি। যাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোন রোগ বহন না করে কচ্ছপগুলো,” উল্লেখ করেন শাহরিয়ার সিজার।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সার্কেলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বেঙ্গল ডিসকাভার-কে বলেন, “আমাদের প্রকৃতি থেকে পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছিল। সংরক্ষিত প্রজনন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা প্রজাতিটিকে সংরক্ষণে চেষ্টা করে যাচ্ছি। যে ১০টি কচ্ছপ পরিক্ষামূলকভাবে প্রকৃতিতে ছাড়া হয়েছে সেগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে কচ্ছপগুলো টিকে থাকতে সক্ষম হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে দ্রুতই পুরোপুরিভাবেই তাদের বন্য পরিবেশে মুক্ত করে দেয়া হবে।”

কচ্ছপ ও কাছিমের পার্থক্য: পানিতে বিচরণ করে ’কাছিম’ এবং স্থলে বিচরণ করে ’কচ্ছপ’।

পাহাড়ি শিলা কাছিমের ইংরেজি নাম: এশিয়ান জায়ান্ট টরটইজ/Asian Giant Tortoise। বৈজ্ঞানিক নাম: মনুরিয়া এমিস ফায়ারেই/Manouria emys phayrei। কচ্ছপগুলোকে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার আগে কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্রের কোন রোগ-ব্যাধি প্রাণীগুলোর শরীরে রয়েছে কিনা বা প্রাকৃতিক পরিবেশে যাতে কোন রোগের বিস্তার না ঘটে সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করে সিসিএ’র গবেষকরা।

গবেষকরা বলছেন, বিশ্বে টিকে থাকা আদিম প্রাণিগুলোর মধ্যে কচ্ছপ-কাছিম অন্যতম। শতশত বছর ধরে প্রতিকূল পরিবেশে আজও বেঁচে আছে প্রাণীটি। বাংলাদেশের বন-জঙ্গলে এক সময় প্রচুর কচ্ছপ ও হাওর অঞ্চলে কাছিমের দেখা মিলত। তবে নানা কারণে কমছে প্রাণীটির সংখ্যা।

কচ্ছপের পরিক্ষা-নিরীক্ষা করছেন একজন গবেষক।

পৃথিবীতে এখন টিকে আছে ৩৬১ প্রজাতির কচ্ছপ-কাছিম। এর ৫১ শতাংশ রয়েছে বিপন্ন অবস্থায়। বাংলাদেশে ২৫ প্রজাতির মিঠাপানির কচ্ছপ-কাছিমের দেখা যায়। এরমধ্যে ২১ প্রজাতির কচ্ছপ-কাছিমকে বাংলাদেশসহ বিশ্বে বিপন্ন, মহাবিপন্ন ও সংকটাপন্ন ঘোষণা করেছে প্রকৃতি ও প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইইউসিএন। মূলত প্রাকৃতিক বনভূমি দখলের ফলে বিচরণক্ষেত্র বিনষ্ট, কচ্ছপের মাংসের চাহিদার জন্য শিকার এবং পাচার বৃদ্ধির জন্য বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের কচ্ছপ ও কাছিম প্রজাতি।

বংশ বিস্তার যেভাবে:

মহাবিপন্ন চার প্রজাতির কচ্ছপ এবং কাছিম বুনো পরিবেশ থেকে উদ্ধার করে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে চলছে বংশ বিস্তার। এজন্য একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কচ্ছপদের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। সেখানে খাবারের জন্য লাগানো হয় বিভিন্ন উদ্ভিদ ও সবুজ ঘাস। ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন এলায়েন্স বলছে, পার্বত্য অঞ্চলে জীব-বৈচিত্র্যের বাস্তব চিত্র জানতে ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জরিপ চালায় সংস্থার গবেষকরা।

কচ্ছপ সংরক্ষণের প্রথম ধাপে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয়দের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে দশটি গ্রামের শিশুদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কার্যক্রমে ১২০ জন পাহাড়ি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে।

দ্বিতীয় ধাপে ২০১৭ সালে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে বাংলাদেশ বনবিভাগের সহযোগিতায় তৈরি হয় কচ্ছপ সংরক্ষণ সেন্টার। সেখানেই মহাবিপন্ন ১৬টি আরাকান কাছিম, শিলা কচ্ছপ, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ ও দিবা কচ্ছপের মাধ্যমে শুরু হয় বংশবিস্তার কার্যক্রম।