গণমাধ্যমে উঠে আসুক বন্যদের কথা

করোনায় বন্ধ জীবন। বন্ধ গাড়ির চাকা। বাতাসে নেই উড়ন্ত ধূলির রাজত্ব। গাছের পাতা আজ ধূলির অভিশাপমুক্ত। চারদিকে এসেছে সজীবতা। ফুটেছে রঙিন ফুল। রক্তবরণ ফুলে বসেছে মৌমাছি। সেই ফুলের একটু একটু করে মধু নিয়ে মৌমাছি গড়েছে বিশাল চাক। সেই মধু সংগ্রহ করে খেয়ে সতেজ হয়েছেন করোনা রোগী মাসুদ।

এ একটি জীবনচক্র। শুধু কি ফুলের মধুই নিয়েছে মৌমাছি। না, সাথে পরাগায়ন ঘটিয়েছে অসংখ্য গাছে। ধরুন শুধু একটি লেবু গাছেই পরাগায়ণ ঘটিয়েছে এই মৌমাছি। এতে ফলন হয়েছে লেবুর। আবার করোনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে সেই লেবুই। ভাইরাসকে মেরে সুস্থ করে দিয়েছে মাসুদ মিয়াকে।

কে লড়ছে করোনার বিরুদ্ধে?

কেউ বলছে বিজ্ঞান, কেউ বলছে ডাক্তার, কেউ পুলিশ বা সেনাবাহিনী ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রত্যেকেই নিজে লড়ছেন দাবি করে প্রত্যাশা করছেন পুরস্কারেরও। কিন্তু কোনো প্রতিদান না চেয়েই প্রকৃতির দেয়া মহামারির বিরুদ্ধে নিস্বার্থ লড়ে যাচ্ছে প্রকৃতি নিজেই। খেয়াল করে দেখুন বিজ্ঞান বলেন আর চিকিৎসক বলেন বৈদ্য আবিষ্কারে সবাইকেই ফিরতে হচ্ছে সে প্রকৃতির কাছেই।

এতো বললাম মাত্র ছোট্ট একটি প্রাণীর গুণের কথা। প্রতিনিয়ত মানুষের নানা প্রয়োজনে নিস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে প্রকৃতির অনেক প্রাণী। যাদের অবদান অজানাই রয়ে যায় উপকারভোগীর কাছে। ফলে বরাবরই অবহেলিত থেকে যায় সেই বন্যরা।

এই ধরুন ছোট্ট একটা প্রাণী ব্যাঙের কথাই বলি। রাস্তাঘাটে চলতে যে কেউ কিক মেরে বসেন এ ব্যাঙের গায়ে। কৃষক মশাই কিটনাশক ছিটিয়ে ব্যাঙ ছাড়া করেন স্বাধের ফসলি জমিটা। অথচ গবেষকরা বলছেন, একটি কুনোব্যাঙ তার জীবনে শুধুমাত্র পোঁকা খেয়ে অন্তত ৪ লাখ ২০ হাজার টাকার ফসল রক্ষা করে। এতে কিটনাশকের ব্যয় কমার পাশাপাশি রক্ষা পায় অনেক দূষণ থেকেও। একইভাবে ফসলের পরাগায়ণ, পোকামাকড় দমনে ভূমিকা রেখে আসছে পাখিসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। একটি প্রাণী আরেকটিকে খেয়ে জীবন ধারণ করছে যার মাধ্যমে আল্টিমেটলি উপকার ভোগ করছে মানুষ।

যদিও কখনোই মানুষ ভাবেনি প্রকৃতিতে এসব প্রাণীর অবদানের কথা। বরং বরাবরই নিজেদের শত্রু মনে করেছে প্রাণীদের। সৃষ্টির শুরু থেকে যারা পৃথিবীকে বুনে এসেছে সেসব প্রাণীকূলকে কিভাবে দমিয়ে রাখা যায় সেই ভাবনাই সবসময় কাজ করেছে স্বার্থপর মানুষের মনে।

কেনই বা করবে না। আমরা যতটা মানুষের কথা বলি, নগরায়নের কথা বলি তার সিকিভাগও কি বলেছি এসব প্রাণীর অবদানের কথা। কখনো গণমাধ্যমে উঠে এসেছে কি বন্যদের অর্থনৈতিক অবদানের হিসাব? আসেনি। আর আসেনি বলেই কলকারখানার বিপরীতে একটি মৌমাছির দল যে বিশাল অর্থনীতির চাকা ঘুরাচ্ছে তা রয়ে গেছে আলোচনার বাইরে। উপেক্ষিত রয়ে গেছে ছোট্ট পাখি টুনটুনি বা কুনোব্যাঙের আত্মত্যাগের কথা। অথচ যুগের পর যুগ এরা যে অর্থনীতির ভীত গড়ে যাচ্ছে তাতে ছিলো না কোনো দূষণ। ছিল না জলবায়ুতে কোনো প্রভাব।

করোনার লকডাউন আমাদের চোখ খুলেছে। মাথায় এনেছে নতুনের গান। এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। এখন ভাবনার সময় মানুষ কোন পথে হাটবে। কথা বলবে কোন সূরে? আবারো কি বুঝে শুনে সেই অঙ্গারে ঝাঁপ দিবে, না নিজের পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে করে গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রকেরা। এখন ভাবতে হবে নিজের সুস্থতার কথা, ভাবতে হবে পৃথিবীর সুস্বাস্থ্যের কথা।

আর পৃথিবীকে সুস্থ রাখতে হলে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে দূষণ, রক্ষা করতে হবে প্রাকৃতিক পরিবেশ। আর এ কাজে অগ্রপথিক হতে পারে জাতির চোখ গণমাধ্যম। এই গণমাধ্যমই পারে মানুষকে দেখাতে আগামীর পথ। দেখাতে পারে একটি সুন্দর পৃথিবীর পথ। যে পৃথিবী হবে সবুজে পরিপূর্ণ, যেখানে প্রাণ খুলে গাইবে পাখিরা। সানন্দে চলবে বন্যরা আর সুস্থভাবে নিশ্বাস নিবে মানুষেরা।

লেখক: পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক সাংবাদিক, বাংলাদেশ।

***প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বেঙ্গল ডিসকাভার কর্তৃপক্ষ লেখকের মতামতের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।