চূড়ান্ত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্ত:দেশীয় বন্যপ্রাণী করিডোর

বুনো এশিয়ান হাতি। ছবি: মনিরুল হাসান খান, প্রাণীবিদ।

বন্যপ্রাণীর অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুরু হয়েছে বাংলাদেশে, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে আন্ত:দেশীয় বন্যপ্রাণী করিডোর বাস্তবায়নের উদ্যোগ। ইতিমধ্যেই বন্যপ্রাণী বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা শেষ করে এনেছে বাংলাদেশ। পিছিয়ে নেই ভারতও। এ কাজে নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইইউসিএন’কে। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতায় এ কাজে পিছিয়ে মিয়ানমার।

বন বিভাগ বলছে, সম্ভাব্য আন্ত:দেশীয় করিডোর চিহ্নিতকরণ ও বাস্তবায়নে আইইউসিএন নিজস্ব গবেষক ও দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে শেষ করে এনেছে মাঠে-দপ্তরে গবেষণা। এই প্রকল্প বান্তবায়নের মাধ্যমে স্থলভাগের বড় প্রাণী হাতিসহ সকল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে যোগ হবে নতুন মাত্রা। বাংলাদেশের এ উদ্যোগের নামকরণ করা হবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্ত:দেশীয় বন্যপ্রাণী করিডোর’।

৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের একটি হোটেলে দিনব্যাপী ট্রান্স বাউন্ডারি ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর-এর সমীক্ষা যাচাইয়ের একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মতামত দেন বন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা।

বনপ্রাণী সংরক্ষণ সার্কেলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম জানান, “সীমানাবর্তী অঞ্চলসহ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচরণ করা বাঘ ও হাতিসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ট্রান্স বাইন্ডারি ওয়ালাইল্ড করিডোর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পটি পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন অংশিদারদের সমন্বয়ে করা হবে। এতে হাতির মতো বন্যপ্রাণীদের করিডোর সুরক্ষিত রাখতে সহজ হবে।”

কর্মশালায় আইইউসিএন বাংলাদেশে-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ রাকিবুল আমিন বলেন, “দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে বনভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জগুলো বাড়ছে। তাই ভূমিতে নজরদারি বাড়ানোসহ বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করা ট্রান্স বাউন্ডারি ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর প্রকল্পের লক্ষ্য। তবে এই প্রকল্পে অন্যতম বাধা হচ্ছে মিয়ানমার। কারণ দেশটিকে সামরিক শাসন চলছে, তাই তথ্য পাওয়া সহজ হচ্ছে না।“

“হাতি কোন পথে মিয়ানমার ও বাংলাদেশে প্রবেশ করে সে তথ্য আছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে- দেশটিতে চামড়ার জন্য প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে হাতি। দেশটিতে হাতি প্রবেশ করলে ফিরবে কিনা সে সংকটও আছে। এটি এখন আন্ত:দেশীয় সংকটও। একমুখী সমাধান হবেও না,” যোগ করেন তিনি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু আন্ত:দেশীয় বন্যপ্রাণী করিডোরের সমীক্ষার সময়সীমা ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিসেম্বরেই শেষ হবে সমীক্ষার কাজ। এরপর আবারো দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও অংশিদারদের মতামত নেয়া হবে। সমীক্ষার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন করিডোর ও অভয়ারণ্য এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বন্যপ্রাণীর চলাচলের তথ্য-উপাত্ত। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এগুলো যাচাইও করা হয়েছে। বিশেষ সফটওয়্যারে করা হয়েছে বৈজ্ঞানিক মডেলও। এতে হাতিসহ বন্যপ্রাণীর চলাচল, আবাস, খাবারসহ সংঘর্ষ ও সংকটপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।

আন্ত:দেশীয় ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর প্রকল্পের সমীক্ষা তদারকি ও গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন প্রাণীবিদ- মনিরুল হাসান খান ও আব্দুল আজিজ।

কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা জানান, বাঘ ও হাতিকে ফ্ল্যাগশীপ প্রাণী হিসেবে আইইউসিএন’র সমীক্ষার মডেলিং করা হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এলাকায় হাতি চলাচলের পথ ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংকুচিতে হচ্ছে। অভয়ারণ্য ও বনের আশপাশে উন্নয়ন প্রকল্পসহ মানুষের বসতি ও আবাদ গড়ে ওঠায় এ অঞ্চলে হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীরা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে যেখানে সংকুচিত হওয়া করিডোরগুলোতে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষিত রাখা যাবে।

কর্মশালায় প্রাণীবিদ মনিরুল হাসান খান বলেন, “সমীক্ষা চলাচলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কাসালং ও পাবলাখালী বনে আমরা হরিণ, শুয়োর, ভাল্লুক, বানর, হনুমান পেয়েছি। তাছাড়া বাঘ থাকার মতো যে খাদ্য শৃঙ্খল প্রয়োজন সেগুলোর উপস্থিতি আমাদের ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে এসেছে।”

“আগামীতে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ বন্যপ্রাণী যাতে সুরক্ষিত থাকে সেজন্য বনের যেসব জায়গা এখনো সবুজ রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হাতিসহ বন্যপ্রাণীদের চলাচলের পথ সুরক্ষিত করতে হবে। না হলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়বে,” যোগ করেন মনিরুল হাসান খান।

উপ-প্রধান বন সংরক্ষক জগলুল হোসেইন বলেন, “চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগামে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ রাস্তা তৈরি করতে চায় বন বিভাগ। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৮৫০ কিলোমিটার পথ বন্যপ্রাণীর জন্য সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।”