নয় বছর পর সামুদ্রিক প্রাণী সুরক্ষার উদ্যোগ!

বঙ্গোপসাগরের হাঙর। ছবি: শরীফ সারওয়ার, মেরিন ফটোগ্রাফার, বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন হয়েছে ২০১২ সালে। এই আইনে বনের প্রাণী সুরক্ষার পাশাপাশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সামুদ্রিক প্রাণী সুরক্ষায়ও। কিন্তু নয় বছর পার হলেও সক্ষমতার অভাবে সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণে মাঠ পর্যায়ে তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং সুরক্ষায় করণীয় সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ-কর্মসূচির উদ্যোগ নিতে পারেনি বনবিভাগ। তবে আশার খবর হলো অবশেষে সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণে বনবিভাগ ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বনবিভাগ।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি- ডাব্লিউসিএস এই কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে। এরই অংশ হিসেবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হাঙর এবং রে ফিশ/শাপলাপাতা মাছ সংরক্ষণে চট্টগ্রামে মোটেল সৈকতে ২৭ ও ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত দু’দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করা হয়। বৃহষ্পতিবার ছিল এই প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী দিন। এতে যোগ দেন বনবিভাগ, মৎস্য বিভাগ ও কাস্টমসসের কর্মকর্তারা।

চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর আইনের তফসিল সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর মাধ্যমে বন্যপ্রাণী আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয় হাঙর এবং রে ফিশের নয়টি গণ এবং ৫২টি প্রজাতিকে। একইসঙ্গে জেলে, বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের কাছে এসব শিকার নিষিদ্ধ প্রজাতিটিকে পরিচিত করতে বন বিভাগ ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ। দেরিতে হলেও ‘বিপন্ন’ তালিকায় থাকা হাঙর এবং রে ফিশ প্রজাতি সংরক্ষণে এসব উদ্যোগকে বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

হাঙর (ডানে), স্টিং-রে ফিশ ডামি। ছবি: বেঙ্গল ডিসকাভার

বন্যপ্রাণী পাচারে ওপর নজরদারি করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ট্রাফিক’র জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে শীর্ষ ২০ দেশে বছরে তিন লাখ ৩৩ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন হাঙর এবং রে ফিশ ধরা পড়েছে। এসব হাঙর ও রে ফিশের ১৭ শতাংশই রয়েছে ‘অতি বিপন্ন’ তালিকাভুক্ত। প্রকৃতি ও প্রাণী সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইইউসিএনের লাল তালিকায়ও উঠে এসেছে বিষয়টি।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপ-পরিচালক আবদুর রউফ বেঙ্গল ডিসকাভার-কে বলেন, “দেশে কিছু কিছু এলাকার মানুষ হাঙরের মাংস ও শুটকি খেতে পছন্দ করে। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে হাঙরের মাংস, পাখনা, চামড়া এবং হাড় রপ্তানী হচ্ছে। এ অবৈধ রপ্তানী বন্ধে মূলত সরকার আইনের তফসিল সংশোধন করেছে।”

বনবিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিম বেঙ্গল ডিসকাভার-কে বলেন, ‍“বিপন্ন সামুদ্রিক প্রাণী এবং এদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রক্ষায় ২০২১ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ দেশের সাগর সীমানায় বিচরণ করা হাঙর ও রে ফিশ প্রজাতি সম্পর্কিত নতুন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে। এখন প্রজাতিগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মৎস্যজীবী, মৎস্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সচেতন করতে পারলে বিলুপ্তির ঝুঁকি কমবে। এ লক্ষে ওয়ার্ল্ড কনজারভেটিভ সোসাইটি বন বিভাগ ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষিত করছে।”

হাঙর ও স্টিং রে ফিশ সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি একাংশ।
যে কারণে হাঙর ও রে ফিশ/শাপলাপাতা মাছ ঝুঁকিতে:

ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটির সিনিয়র ম্যানেজার এলিজাবেথ ফাহরিন মানসুরের মতে, “সাগরের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় অন্যতম বড় ভূমিকা রাখে হাঙর এবং শাপলাপাতার মতো প্রজাতি। অতিরিক্ত আহরণে এগুলো সবচেয়ে হুমকির মুখে। প্রজাতিগুলো বিশ্বে অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় জেলেরা দিন দিন হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ শিকারে উদ্ধুদ্ধ হচ্ছে।”

”অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীর চেয়ে হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ বেশি দেরিতে বাচ্চা ধারণে সক্ষম হয়, বছরে স্বল্প সংখ্যক বাচ্চা জন্ম দেয় এবং ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, একই সঙ্গে আছে অপরিকল্পিত আহরণ। যা দিন দিন প্রজাতিগুলোর প্রতুলতা কমতে সহায়তা করছে এবং এই প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির অন্যতম কারণও,” যোগ করেন এলিজাবেথ।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ২০১২ সালের আইনে হাঙর ও রে ফিশের ২৩টি প্রজাতিকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ আইনের ফাঁক দিয়ে অনেকেই হাঙরসহ বিভিন্ন প্রজাতির আহরণ নিষিদ্ধ মাছ ও প্রাণী অবৈধভাবে রপ্তানি করে আসছিলো। গত তিন বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্ঠার ফল হিসেবে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে এবার সেই তফসিল হালনাগাদ করা হয়েছে।”

”এখন অবৈধ রপ্তানী বন্ধে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। যাতে কোনটা হাঙরের চামড়া আর কোনটা শাপলাপাতা মাছের চামড়া তা চিনতে পারেন কর্মকর্তারা এবং এগুলো পাচাররোধে ভূমিকার রাখতে পারেন”, উল্লেখ করেন এলিজাবেথ ফাহরিন মানসুর।

ওয়াইল্ড লাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটির ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর জি এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, “আইন বাস্তবায়নে ও নতুন প্রজাতিগুলোকে মানুষের কাছে পরিচিত করতে দেশের উপকূলীয় এলাকায় কর্মশালা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে দুইদিনব্যাপী এই কর্মশালায় মাঠপর্যায়ের ৩০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে জেলে ও ব্যবসায়ীদের সচেতন করা।”

সহযোগিতার আহ্বান...
ব্যস্ত এই পৃথিবীর প্রতিদিনকার শোরগোলে হারিয়ে যায় শত গল্প, না শোনা থেকে যায় হাজারো কথা। অগণিত বন্যপ্রজাতির ক্ষেত্রেও দৃশ্যটি ভিন্ন নয়। ছোট, বড়, বিপন্ন, বন্যজীবনের জটিলতা ও আকর্ষণীয় গল্পগুলোই আমাদের লেখকদের মূল আগ্রহ। প্রতিটি মুহুর্ত আমরা কাটাই এসবের সন্ধানে। পরিবেশ, বন্যপ্রাণী এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সাংবাদিকতা কেবল মাত্র ভালোবাসার টানে শুরু করলেও, নিউজরুম পরিচালনায় প্রতিনিয়ত হার মেনে যায় এই আবেগও। এমন সময় প্রয়োজন হয় সহযোগিতার।

প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর ছবি, ভিডিও এবং তথ্য তুলে ধরার ইচ্ছে নিয়ে পৃথিবীজুড়ে প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণকারী গবেষক, গবেষণা সংস্থা ও সংরক্ষণকর্মীদের সঙ্গে কাজ করছি আমরা। জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করি বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণ-বৈচিত্র্যের তথ্যচিত্র। ওয়েবসাইট ও ম্যাগাজিন দৃষ্টিকটু বিজ্ঞাপনে যাতে ভর্তি হয়ে না থাকে, প্রতিনিয়ত আমরা সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় থাকলেও, আয়ের একটি বড় অংশ কমে যায়। সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোভিড-১৯ কালীন অর্থনৈতিক সংকট। তাই আমাদের লেখকদের যথাযথ সম্মানীর পাশাপাশি বিজ্ঞাপনী আয়ের ক্ষতিপূরণের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানাই। এগিয়ে যেতে চাই একই উদ্দ্যোমে, সঙ্গে চাই আপনাদের সহযোগিতা।

যোগাযোগ: [email protected]