পাহাড়ি হ্রদটির তলদেশে রহস্য উন্মোচনে (ভিডিও)

বগালেকের অসাধারণ এক চিত্র। ছবি: শরীফ সারওয়ার, মেরিন ফটোগ্রাফার, বাংলাদেশ

শীতে ড্রাগন স্থান পরিবর্তন করলেই ঘোলা হয়ে যায় লেকটির পানি, বিশ্বাস করেন আদি বাসিন্দারা। হয়তো দেবতার প্রতি সম্মান ও ভীতির কারণেই তৈরি হয়েছে মুখরোচক সব কল্পকাহিনী। তবে প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি যেন লেকটি, অবস্থান বাংলাদেশে। বলছি বান্দরবান জেলার রুমা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের বগা লেকের জানা-অজানা গল্প এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

যদিও লেকটির উৎপত্তি নিয়ে নেই বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো বিশ্লেষণ। স্থানীয় আদি বাসিন্দারা মনে করেন, ড্রাগন দেবতার অভিশাপে সৃষ্ট বগালেক। এখনো এই লেকের তলদেশে উপবিষ্ট আছেন তিনি।

লেকটির অবস্থান সমুদ্র পৃষ্ট থেকে প্রায় এক হাজার ২১৫ ফুট উচ্চতায়। লেকে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় আঁকাবাঁকা দুর্গম পাহাড়ি পথ। স্থানীয় চাঁদের গাড়ি অথবা পায়ে হেটেও যাওয়া যায় বগা লেকে। যা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক আনন্দের অভিযাত্রাও বটে।

অপরুপ সৌন্দর্যের পাহাড়ি হ্রদ বগালেক। ছবি: শরীফ সারওয়ার, মেরিন ফটোগ্রাফার, বাংলাদেশ

শান্ত স্বচ্ছ নীল জলরাশির অপার সৌন্দর্য ও পাহাড় ঘেরা অপার সৌন্দর্যের বিষ্ময় যেন লেকটি। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালে পর্যন্ত লেকটি নিয়ে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম। মূলত লেকের উৎপত্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ খুঁজে বের করার চেষ্ট করা হয় এতে।

গবেষণাটিতে যুক্ত ছিলেন একই বিভাগের চার শিক্ষার্থী। তারা হলেন রিপুন কুমার দাস, প্রেম আনন্দ দেবনাথ, জাহেদুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম।

অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “গবেষণায় লেকটির পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। গভীরতা নির্ণয় ও তলদেশের ভূমিরূপ নিরূপণ একটি দুরূহ কাজ ছিল। তবে আমরা সফল হয়েছি এতে।

বগালেকের পানির তলদেশ। ছবি: শরীফ সারওয়ার, মেরিন ফটোগ্রাফার, বাংলাদেশ

“স্থানীয়দের বলেছিল, লেকের গভীরতা নির্ণয়ে এর আগে যারাই উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাদেরই ক্ষতি সাধন হয়েছে। কাল্পনিক এইরূপ কুসংস্কার উপেক্ষা করে ২০০৫ সালে প্রথম আমিই লেকটির গভীরতা নির্ণয়ে সক্ষম হই,” উল্লেখ করেন গবেষক।

সুতা-পাথর পদ্ধতিতে পরিমাপ করে বগালেকের সর্বোচ্চ গভীরতা ৩৫ মিটার পাওয়া যায় এই গবেষণায়। তবে পরবর্তীতে ফরাসি ভূতত্ত্ববিদ ড. জন মেরী গার্নিয়ার ২০০৯-১২ সময়ে একাধিক জরিপ পরিচালনা করার পর একই গভীরতা পান। আর ২০১২ সালে পরিচালিত এক গবেষণায়ও একই তথ্য আসে।

অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলামের গবেষণায়, লেকের তলদেশের ৩০টি স্থানে পানির গভীরতা নির্ণয় করা হয়। এর মাধ্যমে লেকের তলদেশের ভূ-প্রকৃতির সমগভীরতা রেখাও প্রস্তুত করা হয়। এতে দেখা যায়, লেকটির গড় গভীরতা প্রায় ১৬ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৩৫ মিটার।

লেকের পানি থেকে অসাধারণ চিত্র। ছবি: শরীফ সারওয়ার, মেরিন ফটোগ্রাফার, বাংলাদেশ

গবেষণাপত্র বিশ্লেষণে বলা আছে, বগালেকের তলদেশের সমগভীরতা রেখাগুলো প্রায় চক্রাকৃতির এবং গভীরতম স্থানটি লেকের তলদেশের উত্তর-মধ্যম জায়গায় অবস্থিত। উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বের তলদেশের ঢাল খুব খাড়া হলেও পূর্ব দিকে বিশেষত দক্ষিণ দিকের ঢালের নতি খুবই কম। এই সমগভীরতা রেখা লেকের পার্শ্ববর্তী ঢালের ধারাবাহিকতারই বিস্তৃতি। লেকের মধ্যভাগে প্রায় বিস্তৃত সমভূমি অবস্থিত।

অন্যদিকে বগা লেকের তলদেশের তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধানে একই সঙ্গে কাজ করে সমুদ্র বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ‘সাইলেন্ট ব্লু’-ও। ২০১৫ সালে লেকটির তলদেশে চিত্র ধারণ করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও মেরিন আলোকচিত্রী শরিফ সারওয়ার।

“দুর্গম পাহাড়ি এলাকার লেকের তলদেশের প্রকৃতি কেমন থাকে তা জানার আগ্রহ থেকে লেকে নেমে পড়ি। তবে অনেক কল্পকাহিনী শোনা গেলেও পানিতে নেমে আমি অপ্রাসঙ্গিক কিছু প্রত্যক্ষ করিনি। তবে পর্যটকদের ফেলা যাওয়া বর্জ্যে চিত্র উঠে এসেছিল।