বন বিভাগকে যা বললো সংসদীয় কমিটি

বাংলাদেশের সংসদ ভবন।

বাংলাদেশে এশিয়ান বন্যহাতি হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। হাতির আবাস ও খাদ্য সংকট নিরসনে বন বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে বলেছে কমিটি। একইসঙ্গে বৈঠকে বনাঞ্চলের জায়গা অবৈধ দখলদার মুক্ত করা, বনের ভেতরে নেয়া অবৈধ পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং এসব ঘটনায় যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছে কমিটি।

২৯ নভেম্বর, সোমবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়। সাবের হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটি সদস্য পরিবেশন, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, তানভীর শাকিল জয়, মো. রেজাউল করিম বাবলু, খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন এবং মো. শাহীন চাকলাদার বৈঠকে অংশ নেন।

কমিটি বলছে, বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে যেসব হাতি মারা গেছে সেখানে সব জায়গাতেই পল্লী বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ। এই সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “প্রায় পাঁচটা হাতি বিদ্যুতের কারণে মারা গেল। এটা নিয়ে মামলা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ থেকে যে সংযোগ দিয়েছে তার সবগুলি অবৈধ। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে বন বিভাগ। এই জমিগুলোও দখল করা। যারা সংযোগ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হবে।”

শেরপুরে বন্যহাতির মরদেহ। ছবি: শাহানুল করিম চপল, বন্যপ্রাণী বিষয়ক আলোকচিত্রী।

২০১৫ সাল থেকে ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশে মৃত্যু হয়েছে মোট ৭৬টি বুনো হাতির। তবে প্রাণী বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, গেল দু’বছরেই মারা গেছে ৪০টি বন্যহাতি। এরমধ্যে ২০২০ সালে ২২টি ও ২০২১ সালের সাড়ে ১০ মাসে ১৮টি। চলতি নভেম্বরে মারা গেছে সাতটি বন্যহাতি। বনবিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও দায়ের করা মামলায় নিহত হাতির বেশিরভাগকেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টে হত্যার বিষয়টি উঠে এসেছে।

গত ২২ নভেম্বর হাতির নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সারাদেশে বন বিভাগ থেকে হাতি চলাচলের জন্য চিহ্নিত ১২টি করিডর সংরক্ষণে নির্দেশনা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। একইসঙ্গে হাতি হত্যা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

হাতির আবাসস্থলে বিকল্প খাবার দেওয়ার সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছে জানিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, “আরেকটা বিষয় আমরা দেখলাম, আগে চারটা করিডোর ছিল উখিয়ার ওখানে। রোহিঙ্গারা আসার কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে। হাতি চলাচল করে খাবারের জন্য। আমরা বলেছি, বিকল্পভাবে ওদের খাবারের ব্যবস্থা করতে, বর্তমানে হাতি যেখানে আছে সেখানেই করা যায় কী না। তা করা গেলে হয়তো ধান ক্ষেতে আসবে না হাতিরা। খাবার কীভাবে দেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে একটা কৌশল ঠিক করা হবে। পরের বৈঠকে বিষয়টি আমাদের জানাবে বন বিভাগ।”

“মানুষের সাথে যাতে হাতির সংঘর্ষ না হয় সেজন্য খাদ্য ও বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। কারও ধানক্ষেত নষ্ট হলে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার একটা বিধানও আছে। হাতিকে না মেরে ক্ষতিপূরণ নিতে পারে ক্ষতিগ্রস্তরা।”

ড্রোন ক্যামেরায় সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ।
সেন্টমার্টিন্স দ্বীপ সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটি

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে ধূমপান মুক্ত ঘোষণা করার সুপারিশ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে সেন্টমার্টিন্স দ্বীপকে ধূমপান মুক্ত এলাকা ঘোষণার এবং দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যটক গমনাগমনের নীতিমালা তৈরির পরামর্শও দেওয়া হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিতে বলা হয়েছে।

সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের কক্সবাজার, কুয়াকাটা সৈকতের দূষণের একটা বড় কারণ, সিগারেটের বাট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও তামাকপণ্য ব্যবহার কমানো নিয়ে প্রতিশ্রতি আছে। এজন্য আমরা ধুমপানমুক্ত দ্বীপ করতে চাই। সেন্টমার্টিন্সে যারা যাবে, তারা দ্বীপে ধুমপান করতে পারবে না। আমাদের সুপারিশের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ও একমত। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে দেবে।”

সেন্টমার্টিন্সে পর্যটক ধারণক্ষমতা নিয়ে নতুন করে সমীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, “নতুন করে একটা এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। সেখানে দ্বীপের ধারণক্ষমতা কত বা কতজন পর্যটক প্রতিদিন যেতে পারে- সে বিষয়গুলো থাকবে।”

“মন্ত্রণালয় আগে একটা জরিপ করেছিল। বলেছিল এক হাজার থেকে ১২৫০ জন যেতে পারে। সেটা এখনও ঠিক আছে কি না, ১২০০ লোকের চাপ নিতে পারে কি না, সেটাও দেখতে হবে। যারা যাবে, তাদের সচেতন করার ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে,” যোগ করেন কমিটির সভাপতি।