বাংলাদেশে নতুন চারটি উদ্ভিদ আবিষ্কার

সদ্য আবিষ্কৃত কচুজাতীয় চারটি নতুন উদ্ভিদ। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের উদ্ভিদকুলে চারটি নতুন নাম যোগ করেছে বাংলাদেশ। এর দুটি পাওয়া গেছে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বনে। বাকি দুটির একটি বান্দরবানে, অন্যটি শেরপুরের বনভূমিতে আবিষ্কৃত হয়। চারটি উদ্ভিদই কচুজাতীয়।

বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা গত চার বছরে এই চার উদ্ভিদ আবিষ্কার করেন। এর বাইরে চার বছরে দেশের উদ্ভিদ প্রজাতির তালিকায়ও ১৫০টি নতুন নাম যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেশে সরাসরি জরিপের মাধ্যমে পাওয়া গেছে ৭৯টি। আর বাকি ৭১টির নাম পাওয়া যায় যুক্তরাজ্যের রয়েল বোটানিক গার্ডেনের সংগ্রহশালায়, যেটি কিউ হারবেরিয়াম নামে পরিচিত।

এই চার উদ্ভিদ আবিষ্কারে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের সাবেক পরিচালক হোসনে আরা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসান। তাঁদের জরিপের ফল ২০১৮ সালে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয়।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) হিসাবে, বিশ্বে প্রায় পাঁচ লাখ প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার উদ্ভিদকে শনাক্ত করেছে কিউ হারবেরিয়াম। উদ্ভিদের প্রজাতি সংরক্ষণবিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের হিসাবে, দেশে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উদ্ভিদের প্রজাতি ছিল ৩ হাজার ৮৪০টি। যদিও পরে আরও ১০টি উদ্ভিদ প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশের উদ্ভিদের বৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও নতুন উদ্ভিদগুলো আবিষ্কারে জরিপ দলের প্রধান সরদার নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশেই এত অল্প স্থানে এত প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। এর কারণ, বাংলাদেশের ভূখণ্ড পলিবাহিত সমতল ভূমি, মিষ্টিপানির প্রবাহ, সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকা এবং পাহাড়ি এলাকার প্রতিবেশব্যবস্থা নিবিড়ভাবে রয়েছে। এর ফলে এখানে নানা ধরনের উদ্ভিদ জন্মে।

নতুন চার উদ্ভিদের একটির নাম রাখা হয়েছে আলোকেসিয়া হারাগানজেসিস। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার হারাগঞ্জ সংরক্ষিত বনে এটি পাওয়া যায়। তাই ওই বনের নামেই উদ্ভিদটির নামকরণ করা হয়। অবশ্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনেও এই উদ্ভিদ দেখতে পেয়েছেন গবেষকেরা। উদ্ভিদটির কয়েকটি চারা ঢাকার চিড়িয়াখানা সড়কে ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের বাগানে রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু বেশি দিন বাঁচেনি।

নতুন আবিষ্কৃত দ্বিতীয় উদ্ভিদটির নাম রাখা হয়েছে আলোকাসিয়া সালারখানি। এটিও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বনভূমি থেকে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস চর্চা, অর্থাৎ কোন উদ্ভিদ কোন প্রজাতির, তা নির্বাচন করার বিদ্যার জনক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মোহাম্মদ সালার খানের নামে এই উদ্ভিদটির নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশের এই বিজ্ঞানী ১৯৯৭ সালে মারা যান।

তৃতীয় উদ্ভিদটির নাম রাখা হয়েছে টাইফোনিয়াম ইলাটাম। এটি সংগ্রহ করা হয়েছে শেরপুর জেলার বনভূমি থেকে। বিজ্ঞানীরা চতুর্থ উদ্ভিদটির নাম দিয়েছেন কলোকাসিয়া হাসানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আবুল হাসানের নামে এটির নামকরণ করা হয়, যিনি উদ্ভিদটি আবিষ্কারে থাকা গবেষক দলের অন্যতম সদস্য। এটিকে স্থানীয়ভাবে বলা হয়ে থাকে তিতা কচু। উদ্ভিদটি সংগ্রহ করা হয় বান্দরবান জেলার বনভূমি থেকে। তবে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এই প্রজাতিটি দেখা গেছে। নতুন আবিষ্কৃত কচুজাতীয় চারটি উদ্ভিদই স্থানীয়ভাবে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসান বলেন, দেশের বনভূমি ছাড়া নদী ও সাগরে প্রচুর উদ্ভিদ রয়েছে। সেখানে ভালো কোনো জরিপ হয়নি। ফলে দেশে প্রকৃতপক্ষে কত উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে, তা এখনো অজানা।

বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বনভূমি এমনিতেই সংরক্ষিত বন হিসেবে চিহ্নিত। সেখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীদের আমরা সংরক্ষণ করে থাকি। দেশে পাওয়া নতুন প্রজাতির উদ্ভিদগুলোর এলাকা চিহ্নিত করেও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’