অবশেষে পেলাম বাঘ মামার দেখা

ভারতের র‌্যানথামবোর জাতীয় উদ্যানে বেঙ্গল টাইগার। ছবি: লেখক

চব্বিশ বছর আগে প্রথমবার সুন্দরবন যাই, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে। সে সময় আমার এক আত্মীয় মুন্সিগঞ্জ বন বিভাগের বিট অফিসে দায়িত্বরত ছিলেন, ফরেস্টার আমির হামজা। সুন্দরবনে ঘুরব, বন দেখব, পাখি-প্রাণীর ছবি তুলব; সেই আনন্দে মশগুল ছিলাম।

মুন্সিগঞ্জ বুড়ি গোয়ালিনি রেঞ্জের অর্ন্তভুক্ত। পুরো সুন্দরবনের মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশি বাঘের বসবাস। তবে বাঘ মামার দেখা পাওয়া বা মামাকে খোঁজার জন্য অবশ্যই সুন্দরবন যাইনি। বলতে গেলে বাঘের দেখা যেন না পাই সেটাই মনে মনে জপছিলাম। দুপুরে মুন্সীগঞ্জ পৌঁছে লাঞ্চ সেড়ে আমার পুরনো জেনিথ ফিল্ম ক্যামেরাটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আশপাশ থেকে কিছু পাখির ছবি তুললাম।

বিকেলে গ্রাম-বাজার-ঘাট ঘুরলাম। বাজারে জিলাপী, বাতাশা ও ভাজাপোড়া খেলাম। রাতে বিট অফিসের ঘাটের পাশের দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে আসা এক আত্মীয়ের সঙ্গে গল্পে মশগুল হলাম। এমন সময় ওখানে এক বন প্রহরীর আগমন ঘটল। ও বললো কদিন আগেও ওখানে একটা মানুষখেকো বাঘ ঘোরাফেরা করছিল। ওরা সবাই ফরেস্ট অফিসের দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে ছিল।

বাঘটি সারারাত নাকি অফিসের নিচের খালি জায়গাটায় ছিল। সারারাত ভয়ে ওরা ঘুমুতে পারেনি। শুনে গা-টা ছমছম করে ওঠল। সঙ্গে সঙ্গে ফরেস্ট অফিসের ভিতর ঢুকে গেলাম। সারারাত ঠিকমতো ঘুমুতে পারলাম না। সকালে বোট এলে অভিযান শুরু করলাম। কদমতলী, কোবাদক, বুড়ি গোয়ালিনীসহ অনেক জায়গা ঘুরে সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জ ফিরলাম। কিন্তু সারাদিনে বাঘ মামার টিকিটিরও দেখা পেলাম না।

এরপর এই চব্বিশ বছরে বহুবার সুন্দরবন গেছি। বেশিরভাগ সময় পাখি-প্রাণীর খোঁজে গেলেও দু’চারবার বাঘ মামার খোঁজেও গিয়েছিলাম। চব্বিশ বছর আগের সেই ভয়ডর কিন্তু এখন আর নেই। তবে দু’একবার আমাদের বেশ কাছাকাছি চলে এলেও মামা কিন্ত এখন পর্যন্ত অধরাই রয়ে গেল। পাখি-প্রাণী ও বাঘ দেখার জন্য শেষ পর্যন্ত সমমনা কয়েকজন মিলে ‘অভিযাত্রিক সুন্দরবন’ নামে টিম গঠন করলাম। কিন্তু বার বার গিয়েও বাঘের দেখা পেলাম না।

শেষমেষ ‘অভিযাত্রিক সুন্দরবন’ টিম সিদ্ধান্ত নিল মামাকে দেখার জন্য ভারত সফরে যাবে। অগ্যতা ওখানেই গেলাম। প্রথম অভিযান হলো ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২০- রাজস্থানের ‘সারিস্কা টাইগার রিজার্ভ’। কিন্তু বিশাল বড় এলাকায় অল্পকিছু বাঘের বসবাস হওয়াও মামার টিকিটিরও দেখা পেলাম না। বিফল মনোরথ হয়ে ভাঙ্গা মনে জয়পুর শহরে ফেরত এলাম। পরদিন সকালে জয়পুর থেকে সাওয়াই মধুপুর শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। উদ্দেশ্য ওখানকার বিখ্যাত ‘রানথামবোর জাতীয় উদ্যান’-এ বাঘ মামাকে খোঁজার চেষ্টা করা।

দুপুরে রানথামবোর প্যালেস হোটেলে পৌঁছে ব্যাগপত্র রেখে লাঞ্চ না করেই ‘রানথামবোর জাতীয় উদ্যান’-এর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ক্যানটার-এ (ছাদখোলা ২০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বাস) ওঠলাম। আমরা চেয়েছিলাম ফোর হুইল ড্রাইভ জিপ-এ (ছাদখোলা ৬ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মারুতি জিপসি)। কিন্তু কোনভাবেই জিপসি জোগাড় করতে না পারায় বিশজনের সঙ্গে অনেকটা বাধ্য হয়েই পার্কে ঢুকতে হলো।

এত মানুষের সঙ্গে যে কি বাঘ দেখব সে কথা চিন্তা করেই মন আরও ভেঙ্গে পড়ল। ক্যানটার এগিয়ে চলল। নানা ধরনের পাখি-প্রাণীর দেখা পাচ্ছি। কিন্তু ছবি তোলায় তেমন একটা মনোনিবেশ করতে পারছি না। এত কষ্ট করে এত দূর এসেও যদি মামার দেখা না পাই তাহলে এ দু:খ কোথায় রাখব? ক্যান্টরে ঘুরছি প্রায় ঘন্টা দেড়েক হয়ে গেছে। এরমধ্যে মামার কোন গন্ধও পাচ্ছি না। ধরেই নিয়েছি আজ দেখা হবে না। কাল সকালে জিপসি পাব। কাজেই কালকের অপেক্ষায়ই থাকতে হবে।

এমন সময় ফিরতি পথে আসা একটি জিপসির গাইড বলল আরও সামনে ওরা মামার দেখা পেয়েছে। এটা শুনেই আমাদের চালক দ্রুত গাড়ি ছোটাল। আর মিনিটি পনের-এর মধ্যে আমরা জায়গামতো পৌঁছে গেলাম। আমরা বেশ উত্তেজিত। মামার আমাদের বেশ কাছে। ওখানে আরও ৪-৫টি ক্যান্টর-জিপসি দাঁড়িয়ে আছে।

আমাদের ক্যান্টরের সামনে একটা ছোট খাল। সেই খালের মধ্যে ছোট একটি পাথর খণ্ডের উপর ছোট্ট এক কুমির বসে আছে। তারপর এক চিলতে জমি। ওখানে ৩-৪টি তিতির (Grey Francolin- আমাদের দেশে যা প্রায় দেড়শ’ বছর পর ২০১৯ সালে দেখা গেছে) খাবার খাচ্ছে। তার খানিকটা উপরে শুকনো ঘাসের উপর রাজকীয় ভঙ্গিমায় মামা বসে আছে। যাক অবশেশে মামার দেখা পেলাম। জীবনটা যেন ধন্য হয়ে গেল!

বিকেলের হালকা রোদে মনপ্রাণ ভরে মামার ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম। একসময় আলো পড়ে আসতে থাকল। মামার কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। যেমন নেই আমাদের প্রতি কোন আকর্ষণ। সে তার মতো ঘাসের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। আরাম করছে। অতঃএর আমরা মামা অভিযান শেষ করে হোটেলের পথ ধরলাম।

পরদিন ভোরে কনকনে শীতে আবারও ‘র‌্যানথামবোর জাতীয় উদ্যান’-এ ঢুকলাম। এবার অবশ্যই ৬ জনের টিমে ফোর হুইল ড্রাইভে। প্রায় ঘন্টা খানেক এদিক-ওদিক ঘোরার পর একটি পয়েন্টে গিয়ে ৪-৫টি জিপসি একত্রিত হলাম। সবাই বলাবলি করছে আশেপাশে কোথাও মামা লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের জিপসি কিছুটা নিচের দিকে গিয়ে আবারও ঘুরে উপর দিকে ওঠে খানিকটা উঁচু জায়গায় গিয়ে থামল।

পাশেই পার্কে একটি পুরনো একতলা বিল্ডিং রয়েছে। আশেপাশের জিপসি থেকে বলছে ঐ যে দূরে মামা লুকিয়ে আছে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও একজনবাদে আমরা কেউই ওর টিকিটিরও সন্ধান পেলাম না। অনুরোধের প্রেক্ষিতে শেষমেষ বিল্ডিংয়ের ছাদে ওঠার অনুমতি মিলল। ছাদে ইতোমধ্যেই প্রচণ্ড ভিড় লেগে গেছে। সাদা চামড়ার লোকেদের ভিড়ে দাঁড়ানোর কোন চান্সই পাচ্ছি না। তবে শেষ পযর্ন্ত বহু কষ্টে একটা দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজে পেলাম। ভাগ্য আমার সুপ্রশন্ন বলতে হবে।

সকালের তীক্ষ্ণ রোদে মামার ঝলমলে হরিদ্রা বর্ণের দেহ চোখে পড়ল। আর যায় কোথায়। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখে রেখে শাটারে ক্লিকের বন্যা বইয়ে দিলাম। অন্য একটি ক্যামেরায় খানিকটা ভিডিও ক্লিপও নিয়ে নিলাম। দেশে না হলেও বিদেশের মাটিতে মনের আশা পূরণ করলাম। তবে এখনও আশায় দিন গুণি একদিন মামার দেখা পাব নিজ দেশে, আমাদের সুন্দরবনে।

লেখক:
অধ্যাপক, বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগার
গাইনিকোলজি, অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ বিভাগ ও পরিচালক (ভেটেরিনারি টিচিং হসপিটাল)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,গাজীপুর।