মুজিববর্ষ: প্রাণ-প্রকৃতি সংরক্ষণেও শ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধু

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন বাঙ্গালী জাতির শ্রেষ্ঠ নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নিম্নভাগের অঞ্চল হওয়ায় এবং জলাভূমির আধিক্য থাকায় অনন্য এক জীব-বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল ফরিদপুর। ডানপিঠে শেখ মুজিব বেড়ে উঠেছিলেন এই জেলা দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা কন্যা মধুমতি নদী তীরের সমৃদ্ধ অঞ্চলে।

মধুমতি নদীর অবিরাম ছুটে চলা তাঁর জীবনকে করেছিল দুর্বার গতি সমৃদ্ধ। তাই তো বাড়ির পার্শ্বে দেখা মাছরাঙ্গা পাখির ধৈর্য্য দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, নিজ লক্ষ্যে পৌঁছুতে কীভাবে অটল ও অবিচল থাকতে হয়। এ যেন প্রকৃতি মা নিজ হাতে গড়ে তুলেছিল বাংলার সুযোগ্য সন্তানকে।

বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির মাঝে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালী জাতির জনক। মানুষের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রাণী সংরক্ষণেও দিয়েছেন দুর্বার নেতৃত্ব। প্রকৃতি ও মানবতার মহান নেতার ১০১তম জন্মদিনে সশ্রদ্ধ সালাম।

প্রাণ-প্রকৃতির বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন বাংলাদেশের জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতি হয়েছিলো অসংখ্য উদ্ভিদের। যুদ্ধ বিধ্বস্থ এ দেশে তাঁর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম শুরু হয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। বিশেষ করে সড়ক ও মহাসড়কের দু’পার্শ্বে। প্রাণীদের জীবনেও সুখ-দু:খ, কষ্ট ও বেদনা আছে-তা উপলব্ধি করে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭২ সালে বন্ধ করেন ঘৌড় দৌড়। এরপর সেখানে রোপন করেন হাজারো জাতের বৃক্ষ।

বঙ্গভবনে বৃক্ষরোপণ করে বাড়ির আঙ্গিনা ও পতিত জমিতে গাছ লাগাতে দেশের মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করেন তিনি। কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন বৃক্ষ রোপণেই মিলবে সুদূর প্রসারী ফলাফল। তাঁর উপলব্ধিতেই ছিল বৃক্ষই নানা প্রজাতির পশুপাখির আশ্রয়স্থল। মানুষের জন্য যেভাবে দেশ গড়ে দিয়েছিলেন, তেমনি প্রাণীদের জন্যও যেন গেঁথে দিয়েছিলেন আবাসস্থলের খুঁটি।

“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান,
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”

ক্রমেই পৃথিবীকে দূষিত করছে মানুষ, ভবিষ্যতেও হবে-তাও উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৩ সালে জারি করেন ওয়াটার পলিউশন কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স। মূলত এই পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশে সূচনা হয়েছিল পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম। পরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বাংলাদেশে রয়েছে উদ্ভিদের এক বিশাল সম্ভার। রয়েছে দু’টি বড় বায়োডাইভারসিটি হটস্পট,যা উদ্ভিদের এক বিশাল বৈচিত্র্য দিয়েছে বাংলাদেশকে। উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ এবং গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম। যা ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

দেশের উদ্ভিদ প্রজাতির নিয়ে মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত যাবতীয় তথ্য-উপাত্তসহ শুষ্ক উদ্ভিদ নমুনা সংরক্ষণ ও শ্রেণিবিদ্যা বিষয়ক গবেষণার একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এই হার্বেরিয়াম। উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষণ এবং বংশ পরম্পরায় যাতে এটির অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে, তাই দেশের নানা প্রান্তের উদ্ভিদ এখানে সংরক্ষণ করা হয়; যা পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

প্রকৃতির বড় উপাদান বন্যপ্রাণীরা। এ দেশের চিরহরিৎ বন, পাতা ঝরা বন এবং প্যারা বনে রয়েছে হাজারেরও বেশি প্রাণীর বিচরণ। কিন্তু ক্রমেই ধ্বংসের মুখে বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণীর আবাস্থল ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে বহু বন্যপ্রাণী। পাশাপাশি রয়েছে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত। আগামীর বাংলাদেশের জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালে প্রণয়ন করেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

উপকূলীয় এলাকার জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানই বঙ্গবন্ধুর। তাঁর নেয়া উপকূলে বনায়ন, সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগগুলো সমুন্নত রাখছে এ দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা। বনশিল্পকে রক্ষায় আধুনিকায়ন করতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন। যেটি রাবার ও কাঠশিল্পকে টেকসই করা, পাহাড়ি ও গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে রয়েছে হাওড়, বাওড়, নদ-নদী, খাল-বিলসহ এক বিশাল জলজ সম্পদ। জলজ প্রাণী, মাছসহ এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ীসহ বিচিত্র সব প্রজাতি। যা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে বঙ্গবন্ধুর। তাঁর উদ্যোগেই স্বাধীন এই বদ্বীপে শুরু হয়েছিল জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ। লাল-সবুজের এই বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের হৃদয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিবুর রহমান।

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।